কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে জমি নামজারি করে দেওয়ার কথা বলে নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মো. আনোয়ারুল ইসলাম ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে টাকা ফেরত, জমির নামজারিসংক্রান্ত অনিয়মের তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা।
অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, আনোয়ারুল ইসলাম একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর স্থায়ী বাড়ি রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের চর নেওয়াজী গ্রামে। নদীভাঙনের কারণে বর্তমানে তিনি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার জোদ্দারপাড়া এলাকায় বসবাস করছেন। মোহনগঞ্জ ইউনিয়নে তাঁর দাদা ও বাবার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি নামজারি করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
লিখিত অভিযোগে আনোয়ারুল ইসলাম দাবি করেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি নামজারির জন্য তিনটি আবেদন করা হলেও সেগুলো বারবার বাতিল করা হয়। পরে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। একপর্যায়ে জমি নামজারি করে দেওয়ার কথা বলে ওই কর্মকর্তাকে নগদ ৫০ হাজার টাকা দেন বলে অভিযোগ করেন আনোয়ারুল ইসলাম। পরবর্তী সময়ে বিকাশের মাধ্যমে পাঁচ দফায় আরও ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। সব মিলিয়ে তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে তাঁর দাবি। এসব লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে কল রেকর্ড ও বিকাশের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করেছেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট তাঁর মৃত তিন বোনের ওয়ারিশদের নামে রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের ধলগাছা মৌজায় অবস্থিত এসএ খতিয়ানভুক্ত জমি নামজারির জন্য আবেদন করা হয়। কিন্তু ওই জমির নামজারি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে জমির রেকর্ড ও নামজারির প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আনোয়ারুল ইসলাম।
তাঁর অভিযোগ, ধলগাছা মৌজার ৩৮৯ নম্বর এসএ খতিয়ানে মূল জমির পরিমাণ ছিল ০.৪৯ একর। কিন্তু আর্থিক সুবিধা নিয়ে খতিয়ানের তথ্য পরিবর্তন করে জমির পরিমাণ ১০.৫৬ একর উল্লেখ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত ২৮৪৬/২৬, ২৮৪৮/২৬ ও ২৭১১/২৬ নম্বর নামজারি মামলার বিপরীতে ২০২৬/১০০০০৮ নম্বর খতিয়ান মো. শফিউজ্জামান মণ্ডলের নামে এবং ২০২৩/১০০০০৯ নম্বর খতিয়ান মোছা. মমতাজ মহলের নামে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, মো. শফিউজ্জামান মণ্ডল চর নেওয়াজী গ্রামের হাজী আহম্মেদ আলীর ছেলে এবং মোছা. মমতাজ মহল নয়ারচর বাজারের মাস্টারপাড়া এলাকার হাজী আহম্মেদ আলীর মেয়ে। সংশ্লিষ্ট জমির পরিমাণ, খতিয়ানের তথ্য পরিবর্তন এবং নামজারির প্রক্রিয়ায় কীভাবে এসব পরিবর্তন হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
আনোয়ারুল ইসলাম জানান, সংশ্লিষ্ট নামজারি খতিয়ানগুলো বাতিলের দাবিতে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট রাজীবপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত আবেদন করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আবেদনটি ৪৪/২৬ নম্বর বিবিধ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। তবে জমির মালিকানা, উত্তরাধিকারীদের অধিকার এবং নামজারিসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট মৌজায় বিএস জরিপ সম্পন্ন হলেও অজ্ঞাত কারণে আরএস রেকর্ড প্রকাশিত হয়নি। আনোয়ারুল ইসলামের দাবি, তাঁর মৃত বোনদের ওয়ারিশদের নামে নামজারির আবেদন করা জমি অন্য এক ব্যক্তির নামে নামজারি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা তাঁকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের নামেও জমির অতিরিক্ত অংশ নামজারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব বিষয়ে ভূমি রেকর্ড, নামজারি মামলার নথি এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেন যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
এ অবস্থায় জমি নামজারির কথা বলে দেওয়া ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি জমির রেকর্ড ও নামজারিসংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চান আনোয়ারুল ইসলাম। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায় প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম অভিযোগটি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “ওই এলাকার আব্দুল ছালাম বর্তমানে রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি নিজের এলাকা মোহনগঞ্জ ইউনিয়নে বদলি হয়ে আসার উদ্দেশ্যে তাঁর এক নিকটাত্মীয়কে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করিয়েছেন। অভিযোগটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
এ বিষয়ে রাজিবপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সায়েকুল হাসান বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা, জমির রেকর্ড পরিবর্তনের বিষয়টি এবং নামজারি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল বা কোনো কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি।
