শিল্পাঞ্চল সাভার আশুলিয়া অস্থির করার পাঁয়তারা করছে সাবেক এমপি সাইফুল - Meghna News 24bd

সর্বশেষ


Thursday, August 13, 2026

শিল্পাঞ্চল সাভার আশুলিয়া অস্থির করার পাঁয়তারা করছে সাবেক এমপি সাইফুল

 


নিজস্ব  প্রতিনিধি :

অধ্যুষিত শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়াকে অস্থিতিশীল করতে ভারতে অবস্থান করে সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি পুরোনো সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানীয় নেটওয়ার্ককে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাভার-আশুলিয়াকে অস্থিতিশীল করার অব্যাহত অপতৎপরতায় সাইফুল ইসলাম হুন্ডি ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে স্থানীয় সহযোগীদের কাছে অর্থ পৌঁছাচ্ছেন। এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নির্দেশনাও দিচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে সাইফুল ইসলামের অনুসারীরা রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। তারাও সাইফুল ইসলামের এই অপতৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শুধু তা-ই নয়, সাবেক এই এমপি সাভার আশুলিয়াকে অস্থিতিশীল করতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সখ্য গড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের সহযোগিতায় অস্ত্র-বিস্ফোরক তৈরি করা হচ্ছে। সম্প্রতি সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বোমা

উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুল ইসলামের সঙ্গে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর গোপন যোগাযোগের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত পৌনে ২টা পর্যন্ত হেমায়েতপুরের শ্যামপুরের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ১৩টি পাইপ বোমা উদ্ধার করে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও পুলিশ। এ ঘটনায় আরিফ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোমাগুলো কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বোমা তৈরি চক্রের প্রধান নাজমুল হাসান ওরফে 'বোমারু মামুন' এখনো পলাতক। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে সাইফুলের সব অপতত্রতা সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ৩০ জুলাই আশুলিয়ার চারাবাগে একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি প্রেসারকুকার বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে। সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দিন বলেন, 'শ্যামপুরের বাসা থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কী উদ্দেশ্যে বোমাগুলো তৈরি করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কোনো অপশক্তি জড়িত থাকলে তাদের আইনের

আওতায় আনা হবে।' সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল আলম জানান, বোমা উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, শিল্পাঞ্চল অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বোমাগুলো তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। এর সঙ্গে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই পালিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম। সেখান

থেকেও সাভার-আশুলিয়ায় নিজের পুরোনো যোগাযোগগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের টার্গেট করে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, সাইফুল ইসলাম এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অনেকে আত্মগোপনে থাকলেও মাঠ পর্যায়ের অনুসারীদের একটি অংশ এখনো সক্রিয়। সাইফুল ইসলাম সীমান্তের ওপার থেকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছেন। সেই অর্থ স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ব্যবহার করে সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সাভার-আশুলিয়ার ঝুট ও স্ক্র্যাপ ব্যবসাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে। জামগড়া, বাইপাইল, ইয়ারপুর ও শিমুলিয়া এলাকার পোশাক কারখানাগুলো থেকে বের হওয়া ঝুট ও স্ক্র্যাপের বড় একটি বাজার রয়েছে এখানে। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, অতীতে যারা সাইফুল ইসলামের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন কারখানার ঝুট ও স্ক্র্যাপ নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাদের একটি অংশ এখনো ব্যবসায় সক্রিয়। তবে রাজনৈতিক

পরিচয় বদলে তারা নতুন নামে ব্যবসা করছেন। কোথাও কোথাও বর্তমান প্রভাবশালীদের সঙ্গে ভাগাভাগির ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, নতুন নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান বা ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে কারখানা থেকে মালামাল নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক

পটপরিবর্তনের পর অনেকে প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করলেও পুরোনো যোগাযোগের মাধ্যমে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

সাইফুল ইসলামের কথিত যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহারের বিষয়ে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাধারণ মোবাইল ফোনের পরিবর্তে এসব অ্যাপ ব্যবহার করে স্থানীয় সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সাংগঠনিক নির্দেশনা, অর্থের বিষয় এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে সেখানে আলোচনা হয় বলেও সূত্রগুলোর দাবি।

অর্থের গতিপথ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, হুন্ডি এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বাইরে থেকে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ব্যবহার করে এসব অর্থ সরবরাহ করা হয়ে থাকতে পারে।

সাইফুল ইসলামের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের একজন সচিবের বিরুদ্ধেও। তিনি বর্তমানে

ধামরাইয়ের একটি ইউপির সচিব। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সাইফুল ইসলাম ধামসোনা ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালে ওই কর্মকর্তা সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। তখন থেকেই তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ ওই কর্মকর্তাকে সাইফুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও আর্থিক সমন্বয়কারী হিসাবেও উল্লেখ করেন। এই সচিবের সম্পদ নিয়েও স্থানীয় মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাভার-আশুলিয়ায় সংঘটিত সহিংসতার স্মৃতি এখনো স্থানীয়দের তাড়িয়ে বেড়ায়। গুলির শব্দ, সড়কে পড়ে থাকা মরদেহ এবং মরদেহ পোড়ানোর অভিযোগে ওই সময় পুরো শিল্পাঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

আশুলিয়া থানার সামনে লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়

তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি পলাতক থাকায় দণ্ড কার্যকর হয়নি।

ঢাকা-১৯ আসনে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ট্রাক প্রতীকে জয়ী হন

সাইফুল ইসলাম। এর আগে ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে শিল্পাঞ্চলে একচ্ছত্র চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এলাকায় রাজনৈতিক এবং অপরাধ সিন্ডিকেটও ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। যারা এখনো তার হয়েই সক্রিয় থেকে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন।

সাইফুল ইসলামের স্থানীয় যোগাযোগ ও সম্ভাব্য নেটওয়ার্কের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সতর্ক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, 'পলাতক রাজনৈতিক নেতাদের স্থানীয় যোগাযোগ ও সম্ভাব্য তৎপরতার বিষয়ে নজরদারি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।'

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম

বলেন, 'পলাতক আসামিরা সুযোগ পেলে এলাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে সূক্ষ্ম নজরদারি করা হচ্ছে।'

বাংলাদেশ শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, 'দেশবিরোধী শক্তি যাতে শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়া কে অস্থিতিশীল করতে না পারে, সেদিকে নজর রেখে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন শিল্প-কারখানার

শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি চলছে। শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ যাতে কেউ অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে লক্ষ্যেই শিল্প পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।' সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাভার-আশুলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার সামান্য আঁচও বড়

ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ বা সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব

পড়ে কারখানা উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায়। ফলে সাইফুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই এখন শুধু রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages