বরিশাল প্রতিনিধি :
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে ১১ আগস্ট গভীর রাতে আটক করা হয় পাঁচ জনকে। তাদের মধ্যে দুই জন পুলিশেরই সোর্স। বাকি তিন জন স্থানীয় যুবক। সেই রাতেই দুই সোর্সসহ চার জনকে ছেড়ে দেয়া হয়। অভিযোগ উঠে, এর বিনিময়ে প্রত্যেককে গুনতে হয় ৩০ হাজার টাকা করে।
একজন স্বজন বলেন, আমাকে বলতাছে মোটা অংকের টাকা যদি না দেই, তাহলে ছেলেকে ছাড়বে না। তখন আমি কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে এসে ধার করে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছি।
আরেকজন স্বজন বলেন, ৩০ হাজার টাকা নিয়ে তারা দুজনকে ছেড়ে দিয়ে যায়। একজনের কাছে দুই লাখ টাকা চেয়েছে, সে এই টাকা কোথায় পাবে।
এমন একটা অ্যামাউন্ট চায়, যে মানুষের তখন ধার হোক, দেনা হোক, যেভাবে হোক তাদের চাহিদাটা মিটাতে হয়। না হলে মামলার শিকার হতে হয়, বলছিলেন আরেকজন ভুক্তভোগীর স্বজন।
ছাড়া হয়নি শুধু নাদিমকে। তার ভাইও ছিলেন আটকের তালিকায়। নাদিমের বাবা জাফর হাওলাদারের অভিযোগ, ছেলেকে ছাড়াতে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। দিতে না পারায় মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসানো হয় নাদিমকে।
মামলার এজাহারে নাদিমকে গ্রেপ্তারের ঘটনাস্থল দেখানো হয়েছে পার্শবর্তী গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া। বাড়ি থেকে অন্তত সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। প্রশ্ন হলো এক জায়গা থেকে আটক করে, নাদিমকে অন্য জায়গায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো কেন?
নাদিমের বাবা জাফর হাওলাদার বলেন, আগৈলঝাড়া থেকে আমার ছেলেকে ধরছে কিন্তু মামলায় দেখাইছে মাহিলাড়া। সেটা গৌরনদী থানায়। আমার কাছে বলছে আমার ছেলের কাছে কিছু পায় নাই। তারা মাহিলারায় গিয়ে কিভাবে পাইল। কিভাবে আমার ছেলেকে ১০১ পিস দিয়া মামলা দিলো?
পুলিশের সোর্স নয়ন ঢালী বলেন, নাদিম ভাই পরিচিত লোক। তিনি পাশে ছিলেন তাকে ধরা হয়েছে। কিছু পাওয়া যায় নাই। আমরা কিছুই দেখি নাই। এটাই সত্য।
মামলার তিন সাক্ষীর একজনকে খুঁজে বের করে স্টার নিউজ। তার দাবি, অভিযানকারী দলটি মুরগি খামারী কাওছারকে খুঁজতে এসে, তাকে না পেয়ে নাদিমকে ধরে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, কাওছারের মুরগির ফার্মের ভেতর আমরা ইয়াবা পাইছি। তখন আমি বলছি, যদি পান, তাতে ও দোষী না। তখন বলছে, না ও কাওছার হিসেবে পরিচয় দিছে। এজন্য আমরা ধইরা নিয়া আইছি। অভিযান আমি দেখি নাই। অভিযানে ছিলামও না।
এবার কাওছারের সন্ধানে স্টার নিউজ। আমাদের সামনেই কল দিলেন ১১ আগস্ট অভিযানে থাকা দলের এক সদস্যকে। বড় ভাই নামে নম্বরটি সেভ করা।
কাওছার ওই পুলিশ সদস্যকে বলেন, নাদিম তো নির্দোষ ছিল? কত পয়সাপাতি দিলে ওর মামলাটা হালকা করা যাবে?
তখন সেই পুলিশ সদস্য বলেন, না, না এটা আমাকে দেয়া লাগবে না, স্যারকে দেন।
কাওছার পাল্টা জানতে চান, কোন স্যারকে দেব, তার নম্বর দেবেন নাকি তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন? তখন ওই পুলিশ সদস্য বলেন, না, না এটা তো আমার মাধ্যমে যাবে। স্যার তোমার কাছ থেকে টাকা নেবে না।
কিন্তু এই বড় ভাই আসলে কে? তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় কাওছারের দেয়া নম্বরটির বিপরীতে নিবন্ধিত ব্যক্তির পরিচয় মেলে। তিনি বরিশাল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কনস্টেবল মনিরুল ইসলাম। তার মুখোমুখি হয় স্টার নিউজ।
এবার কাওছারের সঙ্গে তাঁর ফোনালাপের রেকর্ড শোনানো হলো। একপর্যায়ে স্বীকার করলেন, এটি তারই কণ্ঠ। আর ১১ আগস্ট রাতের অভিযানেও ছিলেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়টি তদন্তের আশ্বাস দিলেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বরিশাল জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলাউল হাসান বলেন, মাদক আপনার যেখান থেকে উদ্ধার হবে, সেটাই প্লেস অব অকারেন্স। এটা যেই থানা অবস্থিত, সেখানেই মামলা করতে হবে। এটা আইনের বিধান। এই আইনের বিধানের ব্যতয় করার কোনো সুযোগ নেই।
বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, পুলিশের যেই সদস্যই হোক, সাক্ষ্য প্রমাণে তার বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাকে কোনোভাবে ছাড় দেয়া হবে না।
মাদকবিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে বরিশালের মানুষ। তবে নিরীহদের হয়রানি না করার দাবি সবার।
