গ্রামের দান বীর ঢাকায় গাড়ি চুরির হোতা - Meghna News 24bd

সর্বশেষ


Saturday, August 29, 2026

গ্রামের দান বীর ঢাকায় গাড়ি চুরির হোতা

 


বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি :

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের হোগলাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার জামাল হোসেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে পদ ছোট হলেও এলাকায় তিনি জনপ্রিয়। দরিদ্রদের দান করেন, স্থানীয় লোকজনের যে কোনো প্রয়োজনে পাশে থাকেন। তার দান-উপকারের গণ্ডি কখনো কখনো নিজের ওয়ার্ডের সীমানা পেরিয়ে ইউনিয়নের সীমানাও ছাড়িয়ে যায়। কৌশলে মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে টাকা আদায় করেন তিনি, সেই টাকার একটা অংশ বিলিয়ে দেন এলাকার অসহায় মানুষের মাঝে। তিনি এক দান বীর। কিন্তু ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) খাতায় এই জামাল হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চুরি-ছিনতাইয়ের হোতা।



ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে চালককে অচেতন করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ে প্রধান দুটি চক্র রয়েছে। এই চক্রগুলোর একটির নেতা এই জনপ্রতিনিধি ৬৭ বছর বয়সী জামাল হোসেন। গত ২০ বছরে এই ব্যক্তি তার দলবল নিয়ে কয়েক হাজার অটোরিকশা চুরি-ছিনতাই করে তা মালিককে ফিরিয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকা কামিয়েছে।


ডিবি সূত্র জানায়, সম্প্রতি বাড্ডা এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চুরির সময় জামাল ও তার দলের পাঁচ সদস্যকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে ডিবি লালবাগ বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিম। এরপরই বেরিয়ে আসে জনপ্রতিনিধির আড়ালে জামালের অপরাধের ফিরিস্তি।


ডিবি লালবাগ বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার এনায়েত কবির শোয়েব বলেন, জামালের চক্রটি টার্গেট করা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালককে কৌশলে অচেতন করে সেটি নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর চালকের মোবাইল ফোন দিয়েই মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মালিকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অটোরিকশা ফেরত দেওয়া হয়। প্রতিটি অটোরিকশা ছিনতাই বা চুরি করে এই চক্রটি মালিকের কাছ থেকে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেয়।


ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, চোর চক্র এবং গাড়ির মালিকদের দরকষাকষির কারণে মালিকপক্ষ বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায় না। এতে জামালের অপরাধটি দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা আড়ালেই ছিল। তাকে গ্রেপ্তারের পর বিস্তারিত বিষয় সামনে আসে।


সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী থেকে অটোরিকশা চোর জামাল: ডিবি ও তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের চর হোগলাবুনিয়া থেকে অনেকটা তরুণ বয়সেই রাজধানী ঢাকায় আসেন জামাল। কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কাজ করতেন। বিয়ে করেছেন দুটি। গ্রামের স্ত্রীর তিন সন্তান। এর মধ্যে এক ছেলে প্রবাসী। ঢাকায় বিয়ে করা দ্বিতীয় স্ত্রীও সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এই সংসারে তার দুটি সন্তান রয়েছে। সিটি করপোরেশনের চাকরির ফাঁকে চালাতেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অবসরে যাওয়ার পর পুরো সময়ই অটোরিকশা চালান তিনি। তবে আড়ালে চোর আর ছিনতাই চক্র গড়ে তুলেছেন।


পুলিশের খাতায় রাজধানীতে অটোরিকশা চুরি-ছিনতাইয়ের অন্যতম হোতা হলেও এই জামালকে এলাকার লোকজন জানেন দানবীর হিসেবে। লোকজন জানেন, তিনি ঢাকায় ব্যবসা করেন। আবার কারও কারও ভাষ্য, আদালতে মুহুরির চাকরি করেন এই জামাল।


হোগলাবুনিয়া গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময়ে নিয়মিত এলাকায় গেলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুব একটা এলাকায় যান না জামাল।

জামালের কয়েকজন প্রতিবেশী জানিয়েছেন, জামাল ঢাকা থেকে গ্রামে আসলে অনেকেই তার কাছে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য যেতেন। সমস্যা শুনে নানা ধরনের সহযোগিতা করতেন।


গোগলাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকরামুজ্জামান বলেন, তারা জানতেন জামাল মেম্বার খুব ভালো মানুষ। নিজের সামর্থ্যমতো মানুষজনকে সহযোগিতা করতেন। সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহারও করতেন।

চেয়ারম্যান বলেন, ‘জামাল মেম্বার ঢাকায় আদালতে মুহুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে আমরা জানতাম। আমার নিজের রাজনৈতিক মামলাসহ গ্রামের লোকজনের মামলায়ও জামিনে তিনি সহযোগিতা করেছেন। ১৫ দিন আগেও তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তবে তিনি যে এত বড় অপরাধী, তা তো জানতাম না।’


জামাল মেম্বারের অনুপস্থিতিতে বেশিরভাগ সময় ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন ওই ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসা. রেক্সনা রহিমা। তিনি  বলেন, ‘জামাল মেম্বার ঢাকায় ব্যবসা করে বলে জানতাম। মেম্বার পদে বিপুল ভোটে পাস করলেও গ্রামে বেশি আসতেন না।’

চেয়ারম্যান আকরামুজ্জামান জানান, ২০২২ সালে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সহজেই জয় পেয়েছিলেন জামাল হোসেন। স্থানীয় মানুষকে দীর্ঘদিন সাহায্য-সহযোগিতা করায় নির্বাচনে জয়ী হতে তার খুব একটা কষ্ট হয়নি। হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে সর্বোচ্চ ৮১৫ ভোট পেয়ে তিনি জয়ী হয়েছিলেন।


যেভাবে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চুরি-ছিনতাই করে জামালের চক্র:


ডিবি পুলিশ সূত্র জানায়, জামালের লোকজন প্রতিদিন দলবেঁধে রাজধানীর রাস্তায় বের হয়। এই দলের যাতায়াতের জন্য জামালের নিজেরই সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। সেটি দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে অটোরিকশার চালকদের টার্গেট করা হয়। বিশেষ করে রাস্তার ফুটপাতের চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়া চালকরা এই চক্রের বড় টার্গেটে থাকে।


গ্রেপ্তার চক্রটিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ডিবির গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের একজন কর্মকর্তা জানান, কোনো চালক গাড়ি থামিয়ে ফুটপাতের দোকানে চা অর্ডার করলে এই চক্রের এক সদস্যও চায়ের অর্ডার করে তখন। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকের চায়ের কাপে কৌশলে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয় চক্রের এক সদস্য। চক্রের আরেক সদস্য যাত্রীবেশে কাছাকাছির গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ভাড়া ঠিক করে। যাওয়ার পথে ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় চালক অসুস্থ হয়ে পড়লে যাত্রীবেশী চক্রের সদস্যরা তাকে অন্য একটি অটোরিকশায় তুলে গ্যারেজে বা কখনো হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়।


ওই কর্মকর্তা বলেন, বেশিরভাগ অটোরিকশায় মালিক বা গ্যারেজ মালিকের মোবাইল নম্বর লেখা থাকে। সেই নম্বর ধরে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর গাড়ি ফিরে পেতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এই টাকা দিলে গাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।


জামাল চক্রের শিকার হয়েছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মো. মিলন বলেন, ঢাকায় ১০ বছর ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান তিনি। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি কলাবাগান এলাকায় গাড়ি থামান চা খাওয়ার জন্য। সেখানে আরও কয়েকজন চা খাচ্ছিল। তাদের মধ্যে দুজন পুরান ঢাকার ওয়ারী যেতে ভাড়া করে।


মিলন বলেন, সেদিন যাত্রী নিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ক্রসিং পার হওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তার আর কিছু মনে নেই। দুদিন পর তার জ্ঞান ফেরে। পরে জানতে পারেন, গাড়ির মালিক জামাল চক্রের কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকায় গাড়ি ফেরত পান।


রাজধানীর কয়েকটি গ্যারেজ ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রায় সবাই জামাল চক্রের নাম শুনেছেন। এ ছাড়াও অলি নামে আরেকটি চক্রও এভাবে অটোরিকশা নিয়ে টাকার বিনিময়ে গাড়ি ফেরত দেয়।


কার ভাগে কত যায়: গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জামাল ও তার সহযোগীরা জানিয়েছেন, অপারেশনে বের হলেই চক্রের প্রতি সদস্যকে ৫০০ টাকা করে পকেট খরচ দিতে হয়। এরপর টার্গেট পূরণ হলে যে ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় হয়, তা থেকে চোরাই অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চালানোর দায়িত্বে থাকা চালক লাভলু মাতব্বর পান দুই হাজার ৫০০ টাকা, টার্গেট করা চালকের সঙ্গে চায়ের অর্ডার দেওয়া ও ওষুধ মেশানোর দায়িত্ব পালন করা লিটন সরদার পান পাঁচ হাজার, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকের সঙ্গে গন্তব্য নিয়ে ভাড়া ঠিক করার দায়িত্ব পালন করা স্বপন পান ছয় হাজার টাকা। চক্রের আরেক সদস্য মো. ইউসুফ মৃধা টার্গেট করা চালকের কাছ থেকে মোবাইল ও গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কাজের জন্য পান ছয় হাজার টাকা। বাকি টাকার পুরোটা যায় মূল হোতা জামালের পকেটে। এভাবে দিনে তারা অন্তত দুটি গাড়ি চুরির টার্গেট নেন।


ডিবি কর্মকর্তারা বলেন, রাজধানীতে চলাচলে নিবন্ধিত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার দাম ১৪ থেকে ১৬ লাখ টাকা। সেটি চুরি হয়ে গেলে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকাতেই মালিক তা ফিরে পাচ্ছেন। এজন্য ঘটনার শিকার হলেও মালিকপক্ষ পুলিশকে জানায় না। এ সুযোগে জামালের চক্রটি বছরের পর বছর ধরে এমন অপকর্ম করার সুযোগ পাচ্ছিল।


কীভাবে চোর চক্রে জড়ালেন জনপ্রতিনিধি জামাল হোসেন: গ্রেপ্তারের পর জামাল জানিয়েছেন, ২০০৫ সাল থেকে সিটি করপোরেশনের কাজের পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটো চালাতেন তিনি। এক দিন ধানমন্ডির আবাহনী মাঠ এলাকায় চা খেতে গিয়ে নিজের অটোরিকশা হারান। তাকেও চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে তার গাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। টাকার বিনিময়ে উদ্ধার করেন সেই গাড়ি। এরপর ধীরে ধীরে নিজেই এই চক্রে জড়ান।


জামালকে নিয়ে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ডিবি সূত্র জানায়, জামাল প্রথমে চুরি হওয়া অটোরিকশার মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যস্থতা করতেন। লাভ বেশি হওয়া এবং এমন অপকর্মে পুলিশের কাছে কেউ খুব একটা অভিযোগ না দেওয়ায় নিজেই গড়ে তোলেন চক্র।

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages